গ্রহান্তরের আগন্তুক
বরিস ইয়েফিমোভিচ আমায় একদিন জানালেন, ‘আজ সন্ধ্যায় বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে একটা আসর করা যাবে।’
জানতাম জাহাজে পলিয়নটলজিস্ট নিজোভস্কি ছাড়াও ভাসিলিয়েভ নামে একজন ভূগোলবিদও এসেছেন। দূরে দীপপুঞ্জে অভিযানের দায়িত্ব তাঁর।
তাছাড়া একজন… জ্যোতির্বিজ্ঞানীও ছিলেন।
‘সেদোভ’-এ তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল যখন জাহাজটা থেমেছিল ‘উস্তিয়ে’তে। একজন ভাগ্যহত ক্যাপ্টেন তার জাহাজের বোটগুলো হারিয়ে বসে। তাকে কতগুলো বোট দেওয়া হচ্ছিল জাহাজ থেকে।
সেদিন ভোরেই আমি এসে দাঁড়িয়েছিলাম ডেকে। তীরভূমিটা যদি দূর থেকেও খানিকটা দেখা যায় এই লোভে। কয়েক মাস কেটে গেছে তীর চোখে পড়েনি।
দিগন্তে ধু ধু করছিল কেবল একটা ফালির মতো...
তবু ওইটেই মহাভূমির তট!
ভোরবেলার আকাশের মতোই পানিটা কমলা রঙের, তার ওপর দেখা গেল একটি মোটর বোট। এগিয়ে আসছিল তীর থেকে।
বোট নামানোর তদারক করছিল যে ফার্স্ট মেট, সে বলল, ‘নতুন প্যাসেঞ্জার আসছে তিনজন। জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক অভিযানের লোক।’
‘জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক অভিযান, এই উত্তরে? সে কী?’
ফার্স্ট মেট অবশ্য কিছুই বোঝাতে পারল না।
এসে পৌঁছল মোটর বোট, ঝুলন্ত সিঁড়ি বেয়ে ডেকে উঠে এলো তিনটি লোক।
প্রথমজন বিশেষ লম্বা নয়, মোটা মোটা হাড়, তবে খানিকটা রোগাটে। মুখটা রোদেপোড়া, গালের হাড় বের-করা, চোখে শিঙের ফ্রেমের চশমা, ঢিপ মতো কপালটায় কেমন অদ্ভুত লাগে চেহারাটা। অস্বাভাবিক লম্বাটে চোখ দুটো যেন নরুনে চেরা।
দূর থেকেই অমায়িকভাবে আমায় নমস্কার করলেন তিনি। তারপর এগিয়ে এসে পরিচয় দিলেন, ‘ইয়েভ্গেনি আলেক্সেয়েভিচ ক্রিমোভ, জ্যোতির্বিদ। উচ্চ-অক্ষ একটা অভিযান চালাচ্ছি আমরা। ইনি নাতাশা গ্লাগোলেভা...মানে নাতালিয়া গেওর্গিয়েভনা। উদ্ভিদবিদ।’
তুলোভরা জ্যাকেট ও ট্রাউজার পরা মেয়েটি আলগোছে করমর্দন করল। মুখটা ক্লিষ্ট, চোখের কোণে কালি। ডেক অফিসার তাকে তৎক্ষণাৎ নিয়ে গেল তার পূর্বনির্দিষ্ট কেবিনে।
তৃতীয় যাত্রীটি তরুণ, ছেলেমানুষ বললেই হয়। মোটর বোট থেকে মাল ওঠানোর তদারক করছিল সে খুব গুরুগম্ভীর ভাব করে।
‘হুঁশিয়ার! যন্ত্রপাতি আছে ওতে, বৈজ্ঞানিক ইনস্ট্রুমেন্ট!’ চেঁচাল সে, ‘বলছি ইনস্ট্রুমেন্ট—হুঁশ নেই?’
যা হোক, যন্ত্রপাতি সবই উঠল ডেকে। টেলিস্কোপের মতো কিছুই কিন্তু আমার চোখে পড়ল না।
উত্তর মেরুতে কী জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক অভিযান করছে তারা? গ্রহ-নক্ষত্র কি ভালো দেখা যায় এখান থেকে?
দিকি দ্বীপের বন্দরে জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে, এই সুযোগে বরিস ইয়েফিমোভিচ তাঁর বৈজ্ঞানিক অতিথিদের সেলুনে আমন্ত্রণ জানালেন।
বুফে পরিচারিকা কাতিয়া স্প্র্যাট মাছ বের করল তার কোনো একটা গোপন মজুদ থেকে। টেবিলের ওপর রাখা হলো ক্যাপ্টেনের নিজস্ব কনিয়াক।
ঘুমের পর উদ্ভিদবিদ নাতাশার গালে রং ফিরেছে, চাঙ্গা হয়ে উঠেছে সে। খাদ্য-পানীয়ের প্রতি সুবিচার প্রদর্শনে বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে সেও সানন্দে যোগ দিলো। ক্রিমোভকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, আপনাদের এই অভিযানটির লক্ষ্য কী?’
মাছের দিকে হাত বাড়িয়ে ক্রিমোভ বললেন, ‘মঙ্গলগ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব প্রমাণ করা।’
‘মঙ্গলগ্রহে?’ চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে উঠলাম আমি, ‘ঠাট্টা করছেন না তো?’
গোল গোল চশমার মধ্যে দিয়ে ক্রিমোভ অবাক হয়ে চাইলেন আমার দিকে, ‘ঠাট্টা করব কেন?’
‘এখান থেকে মঙ্গলগ্রহ পর্যবেক্ষণ করা কি সম্ভব নাকি?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি।
‘না, এসময় সাধারণভাবেই মঙ্গলগ্রহ বিশেষ দৃষ্টিগোচর থাকে না।’
‘জ্যোতির্বিদ, উদ্ভিদবিদ—এঁরা সব আকাশের দিকে না তাকিয়ে মঙ্গলগ্রহ পর্যবেক্ষণ করছেন উত্তর মেরুতে!’ অবাক হয়ে হাত ওল্টালাম আমি।
‘মঙ্গলগ্রহ আমরা পর্যবেক্ষণ করছি আমাদের নিজেদের মানমন্দিরে, আলমা-আতায়, আর এখানে...’
‘আর এখানে?’
‘এখানে আমরা খুঁজছি মঙ্গলগ্রহে যে জীবন আছে তার প্রমাণ।’
‘ভারি ইন্টারেস্টিং!’ উল্লসিত হয়ে উঠলেন নিজোভস্কি, ‘মঙ্গলগ্রহের ক্যানেলগুলো সেই ছেলেবেলা থেকেই আমায় টানছে। স্কিয়াপারেল্লি, লওয়েল! মঙ্গলগ্রহ নিয়ে এই সব বিজ্ঞানীরাই তো কাজ করে গেছেন?’
‘তিখোভ,’ রায় দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন ক্রিমোভ, ‘গাভ্রিইল আন্দ্রিয়ানভিচ তিখোভ।’
‘নতুন বিজ্ঞান গড়েছেন তিনি—জ্যোতিরুদ্ভিদ, অ্যাস্ট্রোবোটানি!’ সোৎসাহে বলল মেয়েটি।
‘জ্যোতিরুদ্ভিদ বিজ্ঞান?’ ফের জিজ্ঞেস করলাম আমি। ‘জ্যোতিষ—অর্থাৎ তারা—নক্ষত্র: তার সঙ্গে
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments